আগে আমরা UNEP (ডাক্তার) এবং WMO (ল্যাব টেকনিশিয়ান)-এর কথা বলেছিলাম। আমি সেখানে বলেছিলাম যে, এই দুজনের একটি "সন্তান" আছে।
সেই সন্তানটিই হলো IPCC। আসুন, IPCC-কে একদম গল্পের মতো করে পুরোটা জেনে নিই।
১. সহজ পরিচয়: "বিশ্বের প্রধান বিজ্ঞান শিক্ষক" বা "মেডিক্যাল বোর্ড"
IPCC-কে আপনি পৃথিবীর "মেডিক্যাল বোর্ড" ভাবতে পারেন।
ডাক্তার (UNEP) এবং ল্যাব টেকনিশিয়ান (WMO) মিলে ১৯৮৮ সালে এই বোর্ড গঠন করে। এদের কাজ রোগী দেখা বা ওষুধ দেওয়া নয়। এদের কাজ হলো—সারা বিশ্বের হাজার হাজার বিজ্ঞানীর গবেষণাপত্র পড়ে একটা চূড়ান্ত "রিপোর্ট কার্ড" তৈরি করা।
পুরো নাম: Intergovernmental Panel on Climate Change.
জন্ম: ১৯৮৮ সালে।
বাবা-মা: WMO এবং UNEP।
সদর দপ্তর: জেনেভা, সুইজারল্যান্ড।
২. এরা আসলে কী করে? (সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা ভাঙান)
অনেকে ভাবেন IPCC-র নিজস্ব ল্যাবরেটরি আছে বা এরা নিজেরা গবেষণা করে। এটা ভুল!
আসল কাজ: এরা নিজেরা কোনো গবেষণা করে না। সারা বিশ্বে আবহাওয়া নিয়ে যত বিজ্ঞানী যা কিছু গবেষণা করেন, IPCC-র সদস্যরা (যারা নিজেরাও বিজ্ঞানী) সেই হাজার হাজার পেপার পড়েন, যাচাই করেন এবং সারসংক্ষেপ তৈরি করেন।
উদাহরণ: ধরুন, হাজারটা বই পড়ে কেউ যদি আপনাকে ৫ পৃষ্ঠার একটা সামারি লিখে দেয়, যাতে আপনি সহজে পুরোটা বুঝতে পারেন—IPCC ঠিক এই কাজটিই করে বিশ্বনেতাদের (UNFCCC) জন্য।
৩. এদের কাজের ধরণ (Assessment Reports)
IPCC প্রতিদিন বা প্রতি বছর রিপোর্ট দেয় না। এরা ৫ থেকে ৭ বছর পর পর একটা বিশাল রিপোর্ট প্রকাশ করে, যাকে বলা হয় Assessment Report (AR)। এই রিপোর্টগুলোই হলো জলবায়ু বিজ্ঞানের "বাইবেল"।
এ পর্যন্ত ৬টি বড় রিপোর্ট এসেছে।
সর্বশেষ রিপোর্ট (AR6): এটি ২০২৩ সালে পুরোপুরি শেষ হয়েছে। এতে পরিষ্কার বলা হয়েছে—"Code Red for Humanity" (মানবতার জন্য লাল সংকেত)। মানুষের কারণেই যে পৃথিবী গরম হচ্ছে, এটা এতে ১০০% নিশ্চিত করা হয়েছে।
বর্তমান অবস্থা (২০২৫ সাল): এখন AR7 (সপ্তম সাইকেল)-এর কাজ শুরু হচ্ছে। ২০২৯-৩০ সালের দিকে এর পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট আসবে।
৪. IPCC-র ৩টি দল (Working Groups)
IPCC-র কাজকে সহজ করার জন্য ৩টি দলে ভাগ করা হয়েছে। মনে রাখার জন্য এভাবে ভাবুন:
গ্রুপ ১ (The Scientists): এরা বলে "কী ঘটছে?"
এরা ফিজিক্স নিয়ে কাজ করে। তাপমাত্রা কত বাড়ল, বরফ কত গলল—এসব হিসাব দেয়।
গ্রুপ ২ (The Victims): এরা বলে "এর ফলে কী ক্ষতি হবে?"
কোথায় বন্যা হবে, কোথায় খরা হবে, বাংলাদেশের কতটুকু ডুববে—এসব ভয়ের কথা এরা শোনায়।
গ্রুপ ৩ (The Solvers): এরা বলে "বাঁচার উপায় কী?"
কীভাবে কার্বন কমানো যাবে, সোলার প্যানেল বা ইলেকট্রিক গাড়ি ব্যবহার করলে লাভ হবে কি না—এসব সমাধান এরা দেয়।
৫. কেন এরা এত গুরুত্বপূর্ণ?
UNFCCC-তে যে নেতারা (COP মিটিংয়ে) ঝগড়া করেন বা সিদ্ধান্ত নেন, তারা কিন্তু বিজ্ঞানী নন। তারা পলিটিশিয়ান। তারা টেবিলের ওপর IPCC-র রিপোর্ট রেখে বলেন, "দেখুন, বিজ্ঞানীরা কী বলছেন! আমাদের এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে।"
অর্থাৎ, IPCC হলো প্রমাণ (Evidence) বা ভিত্তি।
বড় সম্মান:
২০০৭ সালে IPCC নোবেল শান্তি পুরস্কার পায় (আমেরিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোরের সাথে যৌথভাবে)। কারণ, জলবায়ু পরিবর্তন আটকাতে পারলে ভবিষ্যতে যুদ্ধের ঝুঁকি কমবে, তাই এটি শান্তির কাজ।
৬. এক নজরে সারসংক্ষেপ (মনে রাখার চার্ট)
| IPCC কী? | জলবায়ু পরিবর্তনের বিজ্ঞান যাচাই করার সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক সংস্থা। |
| জন্মদাতা | UNEP এবং WMO। |
| কাজ | নিজেরা গবেষণা করে না, অন্যের গবেষণা যাচাই করে রিপোর্ট (Assessment Report) দেয়। |
| সবচেয়ে বড় কথা | এরা যা বলে, তা বিশ্বের সব দেশ ও সরকার মেনে নিতে বাধ্য (বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে)। |
| পদমর্যাদা | "সায়েন্স স্পিকস টু পাওয়ার" (ক্ষমতার কাছে বিজ্ঞানের ভাষা)। |
সহজ কথায়:
পৃথিবীর জ্বর মাপা এবং সেই জ্বরের কারণ ও ভবিষ্যৎ বলে দেওয়াই হলো IPCC-র কাজ। তাদের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই COP মিটিংগুলোতে দেশগুলো চুক্তি সই করে।
Comments
Post a Comment