ভারতীয় উপমহাদেশ ও বাংলা ইউরোপীয়দের আগমন

ইতিহাসের এই কাঠখোট্টা বিষয়টাকে আসুন আমরা একটা "নেটফ্লিক্স ওয়েব সিরিজ" বা "অ্যাকশন মুভি"-র মতো করে দেখি। তাহলে আর ভুলবেন না।

ভারতীয় উপমহাদেশ ও বাংলায় ইউরোপীয়দের আগমনকে আমরা নাম দিতে পারি: "দ্যা গ্রেট ইন্ডিয়ান মসলা ওয়ার (The Great Indian Spice War)"

মূলত এরা এসেছিল আমাদের মসলা (Spice) আর মসলিন কাপড়ের লোভে। ভাবুন তো, ইউরোপের মানুষ তখন মাংস সেদ্ধ করে নুন দিয়ে খেত, আমাদের মসলা তাদের জিভে জল এনে দিল!

সহজে মনে রাখার জন্য ক্রমটি হলো: PD-EF (পিডি-ইএফ)

  1. P = Portuguese (পর্তুগিজ)

  2. D = Dutch (ডাচ বা ওলন্দাজ)

  3. E = English (ইংরেজ/ব্রিটিশ)

  4. F = French (ফরাসি)

আসুন এদের কান্ডকারখানা মজায় মজায় দেখি:


১. পর্তুগিজ (Portuguese) – "পথ প্রদর্শক বা কলম্বাসের কাজিন"

  • কবে এল? ১৪৯৮ সালে। (সবার আগে)

  • নায়ক: ভাস্কো দা গামা। তিনি জাহাজে করে এসে ভারতের কালিকট বন্দরে কলিংবেল বাজালেন।

  • বাংলায় এন্ট্রি: ১৫১৭ সালে চট্টগ্রামে।

  • চরিত্র: এরা ছিল একটু 'রাগী' টাইপের। বাংলায় এদেরকে 'হার্মাদ' (জলদস্যু) বলা হতো। এরা জোর করে মানুষকে খ্রিস্টান বানাত আর ডাকাতি করত। মুঘল সম্রাট শাহজাহান রেগে গিয়ে এদের হুগলি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

  • যা দিয়ে গেছে: আমরা যে আলু, পেঁপে, আনারস, পেয়ারা আর তামাক খাই—এগুলো সব এদের দান। (মনে রাখবেন: সব 'প' দিয়ে নাম—পর্তুগিজ, পেঁপে, পেয়ারা, পাউরুটি)।

২. ডাচ বা ওলন্দাজ (Dutch) – "হিসাবি ব্যবসায়ী"

  • কারা এরা? নেদারল্যান্ডস (হল্যান্ড)-এর লোক।

  • কবে এল? ১৬০২ সালে।

  • চরিত্র: এরা দেখল ইংরেজদের সাথে মারামারি করে পারা যাবে না। তাই এরা বুদ্ধিমানের মতো ভারত ছেড়ে ইন্দোনেশিয়ার দিকে চলে গেল মসলার ব্যবসায়।

  • মনে রাখার টোটকা: এরা বেশিক্ষণ টেকেনি, তাই এদের নিয়ে চাপ নেওয়ার দরকার নেই। 'টা টা' বলে বিদায় নিয়েছে।

৩. ইংরেজ (English) – "চালাক ভিলেন যারা পরে হিরো সেজেছে"

  • কোম্পানি: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (১৬০০ সালে রানির পারমিশন নিয়ে তৈরি)।

  • মুঘল দরবারে: ক্যাপ্টেন হকিন্স আর টমাস রো এসে সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছে হাতজোড় করে বলল, "হুজুর, একটু ব্যবসার অনুমতি দিন।" জাহাঙ্গীর ভাবলেন, "ছোটখাটো ব্যাপার, দিলাম!" (এটাই ছিল মস্ত বড় ভুল!)।

  • বাংলায় এন্ট্রি: জব চার্নক ১৬৯০ সালে সুতানুটি, গোবিন্দপুর আর কলকাতা গ্রাম কিনে কলকাতা শহরের পত্তন করলেন।

  • ক্লাইম্যাক্স: ১৭৫৭ সালে পলাশীর আমবাগানে মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় সিরাজ-উদ-দৌলা হারলেন, আর ইংরেজরা মসনদে বসে পড়ল।

  • স্থায়িত্ব: প্রায় ২০০ বছর (১৯৪৭ পর্যন্ত) আমাদের ঘাড়ে বসে চা খেয়েছে!

৪. ফরাসি (French) – "দেরিতে আসা যাত্রী"

  • কবে এল? ১৬৬৪ সালে (সবার শেষে)।

  • চরিত্র: এরা ইংরেজদের চরম শত্রু। ইউরোপে যুদ্ধ লাগলে এরা ভারতেও ইংরেজদের সাথে মারামারি করত।

  • ফলাফল: ইংরেজদের সাথে 'কর্ণাটকের যুদ্ধে' হেরে এরা ব্যাকফুটে চলে যায়। চন্দননগর আর পন্ডিচেরির মতো ছোট ছোট জায়গায় এরা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

  • মনে রাখার টোটকা: ফরাসিরা হলো সেই প্লেয়ার যারা খেলায় দেরিতে নেমে বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি।


একনজরে মনে রাখার মজার চার্ট

আগন্তুককবে এল?বিশেষ বৈশিষ্ট্যআপনার যা মনে রাখা জরুরি
পর্তুগিজ১৪৯৮প্রথম এল, প্রথম গেলভাস্কো দা গামা, আলু, পেঁপে, আনারস।
ডাচ১৬০২এল আর চলে গেলইন্দোনেশিয়ায় শিফট হয়ে গেল।
ইংরেজ১৬০০চতুর ব্যবসায়ী২০০ বছর রাজত্ব, কলকাতা তৈরি, পলাশীর যুদ্ধ।
ফরাসি১৬৬৪দেরিতে উপস্থিতচন্দননগরে কুঠি, ইংরেজদের কাছে পরাজিত।

বোনাস টিপস (একবার পড়লেই মনে থাকবে):

  • ডেনিশ (দিনেমার): ডেনমার্ক থেকে এসেছিল। এরা শ্রীরামপুরে আস্তানা গেড়েছিল। মিশনারি কাজ আর ছাপাখানা (Printing Press) তৈরিতে এদের অবদান আছে। পরে ব্যবসার লস খেয়ে সব বেচে দিয়ে বাড়ি চলে যায়।

  • মুঘলদের ভুল: মুঘলরা নৌ-বাহিনী বা নেভি শক্তিশালী করেনি। ইউরোপীয়রা সমুদ্রের রাজা ছিল, তাই তারা ডাঙায় এসেও রাজত্ব করতে পারল।

সারমর্ম:
পর্তুগিজরা রাস্তা দেখাল (P), ডাচরা এসে চলে গেল (D), ইংরেজরা এসে পুরো বাড়ি দখল করল (E), আর ফরাসিরা এসে দেখল বসার জায়গা নেই (F)।

ব্যাস! এই PD-EF সূত্র মনে রাখলেই কেল্লাফতে!

Comments

Popular posts from this blog

These nouns are always plural: মনে রাখার জাদুকরী কৌশল

QUAD (কোয়াড): চারটি গণতান্ত্রিক দেশের কৌশলগত জোট

NATO (ন্যাটো)