IRGC-কে যদি এক কথায় বা এক লাইনে বুঝতে চান, তবে একে বলতে হবে— "রাষ্ট্রের ভেতরে আরেক রাষ্ট্র" (A State within a State)। এরা শুধু একটা আর্মি বা সেনাবাহিনী নয়, এরা ইরানের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সামরিক শক্তির আসল চাবিকাঠি।
আসুন, IRGC-এর পোস্টমর্টেম করি যাতে বিষয়টি গল্পের মতো মনে থাকে।
১. পরিচয়: এরা কারা? (The Identity)
পুরো নাম: Islamic Revolutionary Guard Corps।
ইরানি নাম: ‘সিপাহ-ই-পাসদারান’ (সংক্ষেপে এদেরকে ইরানে শুধু ‘সিপাহ’ বা ‘পাসদারান’ বলা হয়)।
জন্ম: ১৯৭৯ সালে। ইরানে যখন ইসলামী বিপ্লব হলো, তখন বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনী ভাবলেন, পুরনো সেনাবাহিনী (আর্তেশ) হয়তো তাকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করতে পারে। তাই নিজের ক্ষমতা ও বিপ্লবকে টিকিয়ে রাখতে তিনি সম্পূর্ণ আলাদা ও বিশ্বস্ত একটি বাহিনী তৈরি করলেন—সেটাই এই IRGC।
সদর দপ্তর: তেহরান, ইরান।
২. রেগুলার আর্মি বনাম IRGC: পার্থক্য কী?
ইরানে দুটি সেনাবাহিনী আছে। প্যাঁচ এখানেই লাগে।
রেগুলার আর্মি (Artesh): এদের কাজ হলো দেশের সীমান্ত পাহারা দেওয়া এবং বহিঃশত্রুর আক্রমণ ঠেকানো (যেমন আমাদের সেনাবাহিনীর কাজ)।
IRGC (Sepah): এদের কাজ সীমান্ত পাহারা দেওয়া না, এদের কাজ হলো ইসলামী বিপ্লব বা শাসনব্যবস্থাকে রক্ষা করা। অর্থাৎ, দেশের ভেতরে কেউ সরকারের বিরুদ্ধে গেলে এরা ব্যবস্থা নেবে, আবার দেশের বাইরে ইরানের প্রভাব বাড়াতেও এরা কাজ করবে। এরা রেগুলার আর্মির চেয়েও বেশি শক্তিশালী।
৩. এদের হাত কত লম্বা? (শাখা-প্রশাখা)
IRGC-এর প্রধান ৫টি হাত (শাখা) আছে, তবে ২টো সম্পর্কে জানলেই হবে:
কুদস ফোর্স (Quds Force): এটা হলো এদের ‘ইন্টারন্যাশনাল উইং’ বা গোয়েন্দা শাখা। এরা দেশের বাইরে কাজ করে (যেমন: সিরিয়া, লেবানন, ইরাক, ফিলিস্তিন)। হিজবুল্লাহ বা হামাসকে অস্ত্র ও বুদ্ধি দেওয়া এদেরই কাজ।
বাসিজ (Basij): এরা হলো আধা-সামরিক স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী। দেশের ভেতরে আন্দোলন দমন বা নীতি পুলিশি করতে এদের ব্যবহার করা হয়।
অ্যারোস্পেস ফোর্স: ইরানের যত ভয়ঙ্কর মিসাইল, ড্রোন এবং স্যাটেলাইট প্রোগ্রাম আছে, তার সবকিছুর মালিক ও নিয়ন্ত্রণকারী এরা।
৪. কি-প্লেয়ার বা প্রধান চরিত্র (The Big Bosses)
সুপ্রিম লিডার: আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি (IRGC সরাসরি তার হুকুমে চলে, প্রেসিডেন্টের কথায় নয়)।
কাসেম সোলাইমানি (প্রয়াত): তিনি ছিলেন কুদস ফোর্সের প্রধান এবং ইরানের ‘ছায়া কমান্ডার’। ২০২০ সালে ইরাকে মার্কিন ড্রোন হামলায় তিনি নিহত হন। তিনি ছিলেন মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের দাবার গুটি চালার মাস্টারমাইন্ড।
হোসেইন সালামি: বর্তমান IRGC-এর প্রধান কমান্ডার (খুব কড়া ভাষায় কথা বলেন)।
ইসমাইল কানি: বর্তমান কুদস ফোর্সের প্রধান (সোলাইমানির পর দায়িত্ব পেয়েছেন)।
৫. এদের অর্থনৈতিক ক্ষমতা (Business Tycoon)
মজার বিষয় হলো, এরা শুধু বন্দুক চালায় না, এরা ব্যবসাও করে।
ইরানের বড় বড় বাঁধ, রাস্তাঘাট, তেল-গ্যাস কোম্পানি, এবং টেলিকমিউনিকেশন—সবকিছুর ঠিকাদারি IRGC-এর হাতে।
বলা হয়, ইরানের অর্থনীতির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা তারও বেশি এদের নিয়ন্ত্রণে। তাই এদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলে ইরানের পুরো অর্থনীতিতে টান পড়ে।
৬. সাম্প্রতিক ও হট টপিক (Current Affairs - যা জানতেই হবে)
২০২৪ এবং ২০২৫ সালের প্রেক্ষাপটে IRGC সংবাদের শিরোনামে আছে কারণ:
ইসরায়েলে সরাসরি হামলা: ২০২৪ সালে ইরান প্রথমবারের মতো নিজ ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলে শত শত মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালায় (অপারেশন ট্রু প্রমিজ)। এই পুরো অপারেশনটি চালিয়েছে IRGC, রেগুলার আর্মি নয়।
অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স (Axis of Resistance): লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং গাজার হামাস—এই সবাইকে এক সুতোয় গেঁথে রেখেছে IRGC। বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে এদের ভূমিকাই প্রধান।
সন্ত্রাসী তকমা: আমেরিকা ২০১৯ সালেই এদের ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ ঘোষণা করেছে। ২০২৪-২৫ সালে কানাডাসহ ইউরোপের অনেক দেশও IRGC-কে সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বা করেছে।
এক নজরে মনে রাখার ‘ম্যাজিক চার্ট’
| নাম | IRGC / পাসদারান | বিপ্লবের রক্ষক (Guardians) |
| জন্ম | ১৯৭৯ | বিপ্লবের সাথে জন্ম |
| প্রধান কাজ | শাসনব্যবস্থা রক্ষা করা | বডিগার্ড অফ দ্য সুপ্রিম লিডার |
| বিদেশে কাজ করে | কুদস ফোর্স (Quds Force) | কুদস মানে 'জেরুজালেম' (লক্ষ্য ওটাই) |
| কিংবদন্তি | কাসেম সোলাইমানি | মধ্যপ্রাচ্যের মাস্টারমাইন্ড |
| ক্ষমতা | মিসাইল + ড্রোন + ব্যবসা | এক হাতে বন্দুক, এক হাতে টাকা |
| সাম্প্রতিক | ইসরায়েলে ড্রোন/মিসাইল হামলা | ছায়াযুদ্ধ থেকে সরাসরি যুদ্ধে প্রবেশ |
সারকথা:
IRGC হলো ইরানের ‘মেরুদণ্ড’। সরকার পরিবর্তন হোক বা প্রেসিডেন্ট বদল হোক, যতক্ষণ IRGC আছে, ততক্ষণ ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা টিকে আছে। এরা একাধারে যোদ্ধা, গোয়েন্দা এবং ব্যবসায়ী।
Comments
Post a Comment