ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে (British East India Company) যদি আমরা আধুনিক যুগের সাথে তুলনা করি, তবে এরা ছিল "বিশ্বের ইতিহাসের সবচাইতে ভয়ানক স্টার্ট-আপ (Start-up)"

ভাবুন তো, ২১ জন ব্যবসায়ী মিলে একটা কোম্পানি খুলল, আর সেই কোম্পানি শেষমেশ একটা বিশাল উপমহাদেশ শাসন করল! আসুন, এই "কর্পোরেট দানবের" উত্থান-পতনের গল্পটা সিনেমার চিত্রনাট্যের মতো করে দেখি।


সিনেমার নাম: "দোকানদার থেকে জমিদার" (From Traders to Rulers)

পর্ব ১: জন্মকথা ও লাইসেন্স প্রাপ্তি (১৬০০ সাল)

  • লন্ডনে মিটিং: লন্ডনের কিছু ধনী ব্যবসায়ী ভাবল, "ডাচ আর পর্তুগিজরা ইন্ডিয়া থেকে মসলা এনে লাল হয়ে গেল, আমরা কি আঙুল চুষব?"

  • রানির অনুমতি: ৩১ ডিসেম্বর, ১৬০০ সাল। রানি প্রথম এলিজাবেথ সই করে পারমিশন দিলেন। নাম হলো—ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি

  • মজার তথ্য: এদের প্রাথমিক পুঁজি ছিল মাত্র ৩০ হাজার পাউন্ড, যা দিয়ে এখনকার দিনে লন্ডনে একটা গ্যারেজও কেনা যাবে না!

পর্ব ২: ভারতে এন্ট্রি ও "তেল মারা" পর্ব

  • জাহাঙ্গীরের দরবার: প্রথমে ক্যাপ্টেন হকিন্স আর পরে স্যার টমাস রো (১৬১৫) মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের দরবারে আসেন।

  • ডায়লগ: তারা সম্রাটকে বলল, "হুজুর, আমরা সামান্য ব্যাপারী। একটু ব্যবসার অনুমতি দিন।" জাহাঙ্গীর খুশি হয়ে সুরাটে কুঠি বানানোর অনুমতি দিলেন।

  • কৌশল: এরা মুঘলদের খুশি রাখতে বিলিতি মদ, খেলনা আর অদ্ভুত সব উপহার দিত।

পর্ব ৩: তিন শহরের গল্প (বেস ক্যাম্প তৈরি)

কোম্পানি বুঝল, সারা ভারত ধরতে হলে তিনটা মেইন পয়েন্ট লাগবে:

  1. মাদ্রাজ (চেন্নাই): ১৬৩৯ সালে সেন্ট জর্জ দুর্গ তৈরি করল।

  2. বোম্বে (মুম্বাই): এটা সবচাইতে হাসির ঘটনা। ১৬৬৮ সালে ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লস পর্তুগিজ রাজকন্যাকে বিয়ে করলেন। যৌতুক (Dowry) হিসেবে পেলেন আস্ত 'বোম্বে' শহর! রাজা টাকার অভাবে শহরটা কোম্পানির কাছে মাত্র ১০ পাউন্ড ভাড়ায় দিয়ে দিলেন।

  3. কলকাতা: ১৬৯০ সালে জব চার্নক সুতানুটি, গোবিন্দপুর আর কলকাতা গ্রাম কিনে নিলেন। তৈরি হলো ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ।

পর্ব ৪: গেম চেঞ্জার মোড় (পলাশী ও বক্সার)

কোম্পানি দেখল, ব্যবসা করতে গেলে ট্যাক্স দিতে হয়। কিন্তু রাজা হয়ে গেলে উল্টো ট্যাক্স নেওয়া যায়!

  • পলাশীর যুদ্ধ (১৭৫৭): লর্ড ক্লাইভ মীরজাফরকে হাত করে সিরাজ-উদ-দৌলাকে হারালেন। এটা ছিল মূলত একটা 'ফিক্সড ম্যাচ'

  • বক্সারের যুদ্ধ (১৭৬৪): মীর কাসিম চেষ্টা করেছিলেন রুখে দাঁড়াতে, কিন্তু পারলেন না। এই যুদ্ধের পর কোম্পানি আর 'ব্যবসায়ী' রইল না, পুরোপুরি 'শাসক' হয়ে গেল।

  • দ্বৈত শাসন ও দেওয়ানি লাভ (১৭৬৫): লর্ড ক্লাইভ চালু করলেন এক অদ্ভুত নিয়ম—"টাকা সব আমার, দায়িত্ব সব তোমার।" অর্থাৎ, খাজনা তুলবে কোম্পানি (দেওয়ানি), আর দেশ চালাবে পুতুল নবাব।

  • ফলাফল: ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১৭৭০)। বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ না খেয়ে মারা গেল, কিন্তু কোম্পানির ট্যাক্স আদায় বন্ধ হলো না।

পর্ব ৫: ভালো কাজ (নিজেদের স্বার্থে) বনাম খারাপ কাজ

কোম্পানি কিন্তু ১৯০ বছর (১৭৫৭-১৮৫৭) একচ্ছত্র রাজত্ব করেছে।

যা যা বানিয়েছে (নিজেদের সুবিধার জন্য)যা যা ক্ষতি করেছে
রেললাইন: মালপত্র আর সৈন্য দ্রুত নিতে।তাঁত শিল্প ধ্বংস (মসলিন কারিগরদের আঙ্গুল কাটা)।
টেলিগ্রাফ ও ডাক ব্যবস্থা: দ্রুত খবর পাঠাতে।নীল চাষে বাধ্য করা (নীল বিদ্রোহ)।
ইংরেজি শিক্ষা: কেরানি তৈরির জন্য।লর্ড কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (জমিদারি প্রথা)।
সতীদাহ রদ: (রাজা রামমোহন রায়ের চাপে)।বার বার দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি।

পর্ব ৬: দ্য এন্ড গেম (১৮৫৭ - সিপাহি বিদ্রোহ)

  • ঘটনা: এনফিল্ড রাইফেলে গরু ও শূকরের চর্বি মিশিয়ে টোটা তৈরির গুজব ছড়ালো। মঙ্গল পান্ডে গুলি চালালেন। শুরু হলো ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ।

  • রানির অ্যাকশন: ১৮৫৮ সালে ব্রিটেনের রানি ভিক্টোরিয়া বললেন, "ইনাফ ইজ ইনাফ! কোম্পানির আর দরকার নেই।"

  • সমাপ্তি: কোম্পানি বিলুপ্ত হলো। ভারতের শাসনভার সরাসরি ব্রিটিশ রানির হাতে চলে গেল।


সহজে মনে রাখার "ম্যাজিক চার্ট"

সালঘটনামনে রাখার উপায়
১৬০০কোম্পানির জন্মরানির সই (Birth Certificate).
১৬১৫জাহাঙ্গীরের অনুমতিটমাস রো-এর তেলবাজি।
১৬৯০কলকাতা পত্তনজব চার্নকের শপিং (তিন গ্রাম)।
১৭৫৭পলাশীর যুদ্ধমীরজাফরের বেইমানি।
১৭৬৫দেওয়ানি লাভকোম্পানি এখন জমিদার (টাকা কালেক্টর)।
১৭৭০ছিয়াত্তরের মন্বন্তরবাংলা ছারখার।
১৮৫৭সিপাহি বিদ্রোহকোম্পানির কফিনে শেষ পেরেক।

শেষ কথা (Bottom Line):

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি হলো সেই অতিথি, যে আপনার ড্রয়িং রুমে এক গ্লাস পানি খেতে এসে পুরো বাড়ি দখল করে নিল এবং শেষমেশ বাড়ির মালিককে গ্যারেজে থাকতে বাধ্য করল।

আশা করি, এই কর্পোরেট ভিলেনের ইতিহাস এখন আর ভুলবেন না!

Comments

Popular posts from this blog

These nouns are always plural: মনে রাখার জাদুকরী কৌশল

QUAD (কোয়াড): চারটি গণতান্ত্রিক দেশের কৌশলগত জোট

NATO (ন্যাটো)